জনসংখ্যার শর্ত বাদ, বদলাবে জনবল কাঠামো শিক্ষার্থী, পরীক্ষার্থী ও ফল বিবেচনায় এমপিওভুক্ত হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

Posted on January 5, 2010 | Filed under Exclusive News

চারটি সূচক বা মানদণ্ড বিবেচনা করে অপেক্ষমাণ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেতন-ভাতার সরকারি অংশ (মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার-এমপিও) দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এগুলো হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতির তারিখ, শিক্ষার্থী ও পরীক্ষার্থীর সংখ্যা এবং ফলাফল। এসব সূচকের ভিত্তিতে বিদ্যমান এমপিও বাতিল এবং স্থগিত করা হবে।
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতার সরকারি অংশ প্রদান এবং জনবল কাঠামো সম্পর্কিত নতুন নীতিমালায় এ কথা বলা হয়েছে। এ বিষয়ে গঠিত সরকারের উচ্চপর্যায়ের কমিটি গত রোববার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে নীতিমালার খসড়া জমা দেয়। গতকাল মঙ্গলবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে নীতিমালাটি অনুমোদন করা হয়।
এমপিওসংক্রান্ত নীতিমালায় শর্ত পূরণে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানকে প্রথম বছর সতর্কতামূলক চিঠি দেওয়া, ধারাবাহিকভাবে শর্ত পূরণে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানকে দ্বিতীয় বছর ২৫ শতাংশ এমপিও কর্তন ও তৃতীয় বছর ৫০ শতাংশ এমপিও কর্তনের বিধান রাখা হয়েছে। শর্ত পূরণে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানের এমপিও চতুর্থ বছর সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখা হবে।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, এই মুহূর্তে এমপিওভুক্তির অপেক্ষায় আছে নয় হাজার ১৩১টি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা। এগুলোর মধ্যে নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় এক হাজার ৩৫৪টি, মাধ্যমিক বিদ্যালয় দুই হাজার ৬৯৮টি, দাখিল স্তরের প্রতিষ্ঠান এক হাজার ৭০৬টি এবং উচ্চমাধ্যমিক কলেজ ৫৮৬টি। এগুলোর বাইরে বিভিন্ন স্তরের মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে।
জানা যায়, গত প্রায় অর্ধযুগ এমপিও বন্ধ থাকায় এই সুযোগপ্রত্যাশী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে গেছে। কিন্তু শিক্ষা বাজেটে এমপিও খাতে বরাদ্দ চাহিদার তুলনায় খুবই কম। এ কারণে সরকার ক্ষমতায় এসে এ সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়।
নতুন নীতিমালায় এমপিওভুক্তির মানদণ্ড ঠিক করতে মোট ১০০ নম্বর বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এতে একাডেমিক স্বীকৃতির জন্য ২৫, শিক্ষার্থীর সংখ্যার জন্য ২৫, পরীক্ষার্থীর সংখ্যার জন্য ২৫ এবং পরীক্ষায় উত্তীর্ণের হারের জন্য
২৫ নম্বর রাখা হয়েছে। এর মধ্যে স্বীকৃতির তারিখের ক্ষেত্রে প্রতি দুই বছরের জন্য ৫, ১০ বা তদূর্ধ্ব হলে ২৫ নম্বর পাওয়া যাবে। শিক্ষার্থীর সংখ্যার ক্ষেত্রে কাম্য সংখ্যার জন্য ১৫, কাম্য সংখ্যার পরবর্তী প্রতি ১০ শতাংশ বৃদ্ধির জন্য ৫ নম্বর বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পরীক্ষার্থীর সংখ্যার ক্ষেত্রে কাম্য সংখ্যার জন্য ১৫ এবং পরবর্তী প্রতি ১০ জনে ৫ নম্বর পাওয়া যাবে। আর ফলাফলের হারের ক্ষেত্রে কাম্য হার অর্জনের জন্য ১৫ এবং পরবর্তী ১০ শতাংশের জন্য ৫ নম্বর পাওয়া যাবে। এরপর প্রাপ্ত সর্বমোট নম্বরের ভিত্তিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এমপিওভুক্ত করা হবে।
জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা এবং এমপিও নীতিমালা সম্পর্কিত কমিটির প্রধান আলাউদ্দীন আহম্মেদ বলেন, তাঁরা সর্বজন গ্রহণযোগ্য একটি নীতিমালা প্রণয়ন করেছেন। শিক্ষার মানোন্নয়নের কথা বিবেচনা করে অন্য কোনো দৃষ্টিভঙ্গি মাথায় না রেখে কিছু শর্ত বা সূচক অনুসরণের কথা তাঁরা নীতিমালায় বলেছেন। এর ফলে এমপিওভুক্তি নিয়ে ভবিষ্যতে প্রশ্ন উঠবে না এবং যোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারের আর্থিক আনুকূল্য পাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
নীতিমালা অনুযায়ী, এখন থেকে প্রতিটি এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কাজের বার্ষিক মূল্যায়নের (এসিআর) ব্যবস্থা করবে সরকার। পাশাপাশি শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে কর্মকমিশনের মতো একটি কমিশনও গঠন করা হবে। এ ছাড়া এমপিওভুক্তির জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্বাচনের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক সামঞ্জস্যতা রক্ষার কথা বলা আছে এই নীতিমালায়। পাশাপাশি শিক্ষায় অনগ্রসর, ভৌগোলিকভাবে অসুবিধাজনক, পাহাড়ি এলাকা, হাওর-বাঁওড়, চরাঞ্চল, নারী শিক্ষা, সামাজিকভাবে অনগ্রসর গোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী, বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বিশেষ জাতীয় বিবেচনায় শর্ত শিথিল করার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
এত দিন কামিল মাদ্রাসার (স্নাতকোত্তর পর্যায়ের) শিক্ষকদের এমপিও দেওয়া হলেও সাধারণ শিক্ষায় স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর কোর্সে পাঠদানকারী শিক্ষকদের এমপিও ছিল না। নতুন নীতিমালায় স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর পাঠদানকারী কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় কলেজকে পর্যায়ক্রমে এমপিওর আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করলে তিন মাস পরই এমপিও বাতিল হয়ে যায়। বিষয়টি অমানবিক চিহ্নিত করে নতুন নীতিমালায় চাকরির বিরতিকাল অনূর্ধ্ব দুই বছর রাখা হয়েছে। বিদ্যমান নীতিমালায় শিক্ষার্থীর আধিক্য থাকলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অতিরিক্ত শাখা (সেকশন) খুলতে পারে না। কিন্তু নতুন নীতিমালা অনুযায়ী শাখা খোলা যাবে। তবে এ ক্ষেত্রে শহরের প্রতিষ্ঠান প্রাধান্য পাবে।
নতুন নীতিমালায় সব বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও কর্মচারী বাড়ানো যাবে। ’৯৫-এর জনবল কাঠামো অনুযায়ী এত দিন নিম্নমাধ্যমিক স্কুলে পাঁচজন শিক্ষক ও তিনজন কর্মচারী রাখা যেত। কিন্তু এখন থেকে আটজন শিক্ষক রাখা যাবে। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ১২ জন শিক্ষক ও চারজন কর্মচারী রাখার বিধান আছে বিদ্যমান নীতিমালায়। কিন্তু নতুন নীতিমালায় ১৫ জন শিক্ষক আর পাঁচজন কর্মচারী রাখা যাবে। অন্যদিকে বিদ্যমান নীতিমালার পরিবর্তে নতুন নীতিমালা অনুযায়ী উচ্চমাধ্যমিক কলেজে জনবল চারজন, ডিগ্রি কলেজে ১২ জন, দাখিল মাদ্রায় পাঁচজন, আলিম মাদ্রাসায় ১২ জন ও ফাজিল মাদ্রাসায় সাতজন বাড়ানো যাবে। এত দিন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে গ্রন্থাগারিকের কোনো পদ না থাকলেও নতুন নীতিমালায় সহকারী গ্রন্থাগারিক রাখার কথা বলা হয়েছে।
পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের ক্ষেত্রে শর্তাবলির অন্যতম জনসংখ্যার বিষয়টিকে অপ্রাসঙ্গিক মনে করে এটি তুলে দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে নতুন প্রতিষ্ঠান করতে জনসংখ্যা কোনো শর্ত হিসেবে বিবেচিত হবে না। এত দিন প্রতি ১০ হাজার জনগণের জন্য একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করা যেত।

Banner